নোটিশ:
প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে, আগ্রহীগণ যোগাযোগ করুন!
সিলেটে বন্যার আরেকধাপ উন্নতি: ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি

সিলেটে বন্যার আরেকধাপ উন্নতি: ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির আরো একধাপ উন্নতি হয়েছে। প্রায় সবকটি নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচে অবস্থান করছে। সুরমা, কুশিয়ারা, ধলাই, পিয়াইন নদ-নদীর পানি আগের থেকে অনেকটাই কমে গেছে। তবে পানি কমলেও জনসাধারণের দুর্ভোগ বেড়েই চলছে। পানি কমার সাথে সাথে বানভাসি এলাকার বাসিন্দারা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সোমবার বিকেলে কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ২.২৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আর কুশিয়ারার শেওলা পয়েন্টে ০.২৮ ও আমলসিদ পয়েন্টে ০.৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার নিচে অবস্থান করে।
এদিকে সিলেট নগরী, সিলেট জেলা ও সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা কবলিত এলাকাগুলো থেকে পানি নামতে শুরু করলেও জেলার কিছু এলাকায় পানি বাড়ছে নতুন করে। এছাড়াও থেমে থেমে বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে কমছে না সিলেটে কুশিয়ারা নদীর পানি। পানি বৃদ্ধির কারণে নতুন করে বন্যা কবলিত হয়েছে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ভেলকুনা, গয়াসী, বাঘমারা ও ফেঞ্চুগঞ্জ পূর্ববাজার, উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা।
এদিকে, ফেঞ্চুগঞ্জ পূর্ববাজারে পানি উঠার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। যাতায়াতের বিড়ম্বনায় পড়েছেন ওই এলাকার জনসাধারণ। তবে স্থানীয়রা বলছেন- ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে ঢল না নামলে বিপদের আশঙ্কা নেই।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সীমা শারমিন বলেন, পানি বেড়েছে তবে এটা আর আশঙ্কাজনক নয়, বিস্তৃত বন্যা পরিস্থিতি হবে না।
পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে চলতি মাসের ১১ মে থেকে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ধীরে ধীরে বন্যা বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট নগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এক এক করে নগরীর প্রায় ২০ টি ওয়ার্ড বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় অনেক মানুষই বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে অবস্থান করেন।
বন্যায় সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহর, ঘাসিটুলা, মাছিমপুর, ছড়ারপার, তালতলা, কুয়ারপার, কানিশাইল, শামীমাবাদ, মেন্দিবাগ, কামালগড়, চালিবন্দর, যতরপুর, সোবহানিঘাট, কালীঘাট, শেখঘাট, তালতলা, জামতলা, মাছুদীঘিরপার, রামের দিঘীরপার, মোগলটুলা, খুলিয়াটুলা, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, ভার্থখলা, মোমিনখলা, পিরোজপুর, আলমপুর ও ঝালোপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ওঠে। এসব এলাকার অনেক বাসা-বাড়িতে কোমর সমান পানি ছিল।
সোমবার সকালে নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকার রাস্তার পানি শুকিয়ে গেলেও বাসাবাড়ীতে এখনো পানি রয়ে গেছে। নগরীর তালতলা, জামতলা, মণিপুরি রাজবাড়ি, যতরপুর, মিরাবাজার, শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বেশ কিছু বাড়িঘর এখনো পানির নিচে। বাসিন্দাদের ঘরের সামনে এখনো হাঁটুপানি রয়ে গেছে। এ পানি কালো রং ধারণ করে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাই ওইসব এলাকার বাসিন্দারা পানিবাহিত রোগের শঙ্কায় আছেন। এ ছাড়া বন্যার পানিতে বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ভেসে এসে ঘর ও আশপাশে জড়ো হয়েছে। জমে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে মশাসহ নানা কীটপতঙ্গ।
কানিশাইল এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে তারা এখন নিজেদের বাসা-বাড়ি পরিষ্কার করছেন। আসবাবপত্র ধোয়ামোছার কাজও চলছে। যাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছিল, তারাও এখন পরিষ্কারকরণে ব্যস্ত।
এদিকে, বন্যাকবলিত লোকজনের মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগের লক্ষ্মণ দেখা দিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহ শহরের বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য মেডিকেল টিম গঠন করেছে সিলেট সিভিল সার্জন ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া বন্যা কবলিতদের মধ্যে পানি বিশুদ্ধিকরণ ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ করছেন তারা।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. এস এম শাহরিয়ার বলেন, বন্যার কারণে পানিবাহিত রোগ বেড়েছে। এক সপ্তাহে জেলায় ৩৭৬ জন লোক ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ৬ জন চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের মেডিকেল টিম ইউনিয়ন পর্যায় থেকে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে। যাতে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে না পরে। তবে বন্যা পরবর্তী পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সিলেটে বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৪০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। যার মধ্যে সিলেট সদরে ১০টি, দক্ষিণ সুরমায় ৮টি, বিশ্বনাথে ১১টি, ওসমানীনগরে ৯টি, বালাগঞ্জে ৭টি, ফেঞ্চুগঞ্জে ১০টি, গোলাপগঞ্জে ১৬টি, বিয়ানীবাজারে ১৬টি, জকিগঞ্জে ১০টি, কানাইঘাটে ১২টি, গোয়াইনঘাটে ১০টি, জৈন্তাপুরে ১১টি এবং কোম্পানীগঞ্জে ৭টি মেডিকেল টিম গঠিত হয়েছে। এর বাইরে জেলা সদরে ৩টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব মেডিকেল টিমে চিকিৎসক ছাড়াও নার্সসহ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট অনেকেই আছেন। প্লাবিত এলাকার সবখানেই যেন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রতিটি মেডিকেল টিমকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা কবলিত এলাকায় এক সপ্তাহে ৮২৬ জন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮১৭ জন ডায়রিয়া, বাকীরা চর্ম ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তবুও আমরা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা ইতোমধ্যে কাউন্সিলারদের মাধ্যমে পানি নেমে যাওয়া এলাকা সমূহের জন্য ব্লেসিং পাউডার বিতরণ শুরু করেছি। এসব শুকনো পাউডার স্যাতস্যাতে জায়গায় ছিটিয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, নগরীর বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আমাদের ৩টি মেডিকেল টীম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এছাড়া আশ্রয় কেন্দ্র গুলো বন্ধ হয়ে গেলে আমরা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করবো। প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্কের অংশ হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য কর্মী প্রতিদিনই নগরীর স্ব স্ব এলাকায় স্বাস্থ্য বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
সিলেট বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এস. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবারও সিলেটের প্রায় সব এলাকাতেই বন্যা পরিস্থিতির আরো একধাপ উন্নতি হয়েছে। তবে কুশিয়ারার ফেঞ্চুগঞ্জ সীমান্তে বন্যা পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। সব মিলিয়ে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশই উন্নতির দিকে যাচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.




© All rights reserved © 2022 Todaysylhet24.com
Desing & Developed BY DHAKATECH.NET